মার্চে পুঁজিবাজারে বিদেশী লেনদেন কমেছে ৩৫ শতাংশ

দেশের পুঁজিবাজারে ক্রমেই বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমছে।

দেশের পুঁজিবাজারে ক্রমেই বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমছে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নয় বছরে পুঁজিবাজারের মোট লেনদেনে বিদেশীদের অংশগ্রহণ ৩ দশমিক ৮৫ থেকে কমে ১ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরেও এ নিম্নমুখিতা অব্যাহত রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে পুঁজিবাজারে বিদেশী লেনদেনের পরিমাণ কমেছে ৩৫ শতাংশ। এছাড়া গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছরের মার্চে বিদেশী লেনদেন কমেছে ৪০ শতাংশ।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৮১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে বিদেশী লেনদেন বেড়ে দাঁড়ায় ২৬৪ কোটি ১৪ লাখ টাকায়। মার্চে লেনদেনের পরিমাণ কমে ১৭১ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে বিদেশী লেনদেন হয়েছে ২০৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। গত বছরের প্রথম তিন মাসে গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩২০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। তাছাড়া গত বছর ডিএসইতে বিদেশীদের গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩০৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

গত নয় বছরে ডিএসইর মোট লেনদেনে বিদেশীদের অংশগ্রহণ ৩ দশমিক ৮৫ থেকে কমে ১ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৬ সালে ডিএসইতে বিদেশীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা, যা ছিল এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ২০১৭ সালে এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ ছিল বিদেশীদের, টাকার অংকে যার পরিমাণ ১১ হাজার ৪৪৮ কোটি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ডিএসইতে বিদেশীরা যথাক্রমে ৯ হাজার ২৭৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন করেছেন এবং এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৪৮ ও ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। কভিডের বছর ২০২০ সালে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা, যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০২১ সালে এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনে বিদেশীদের অংশগ্রহণের হার নেমে যায় ১ দশমিক ১০ শতাংশে এবং টাকার অংকে যা ৭ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ডিএসইতে বিদেশীদের লেনদেনের পরিমাণ তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এ দুই বছরে এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনে বিদেশীদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে দশমিক ৮৯ ও দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ সময়ে টাকার অংকে বিদেশীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ হাজার ১৮০ কোটি ও ২ হাজার ১৬৭ কোটি। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ডিএসইতে বিদেশীদের লেনদেন কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ছিল গত বছরে এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ১ দশমিক ২২ শতাংশ।

পুঁজিবাজারে ক্রমেই বিদেশীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণকে দায়ী করেছেন বিশ্লেষকরা। এমএসসিআই ফ্রন্টিয়ার মার্কেট সূচকের রিটার্ন ১০ বছর ধরেই শ্লথ অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে বিদেশীরা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, তারল্য ঝুঁকি, মুদ্রা বিনিময় হার ঝুঁকির বিষয়গুলোও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণেও এ খাতের বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এ নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আদালতের দ্বারস্থ হতেও দেখা গেছে তাদের। পর্যাপ্ত ভালো শেয়ারের জোগান না থাকার কারণেও বিদেশীদের কাছে বিনিয়োগের জন্য সুযোগ কম। কভিড-১৯-এর কারণে ২০২০ সালের মার্চে শেয়ার নির্দিষ্ট দরের নিচে যাতে নামতে না পারে সেজন্য ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তখন অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী ক্রেতা না থাকার কারণে শেয়ার বিক্রি করতে চেয়েও করতে পারেননি। ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়টিকেও মুদ্রাবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিদেশীরা। বৈশ্বিকভাবেই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয় বিদেশীদের কাছে। সর্বোপরি সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের বিষয়টিও বিদেশীদের এ দেশ থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের অন্যতম একটি কারণ। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সংকটও বিদেশীদের পুঁজিবাজারবিমুখ হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

আরও